নিউইয়র্কে ২০২০ সালের দুঃস্বপ্ন ফিরিয়ে আনছে ওমিক্রন

160

২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছিল নিউ ইয়র্ক। করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের হানায় ফের সেই দুঃস্বপ্ন ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়ছে। ব্রুকলিনের রেস্তোরাঁগুলো ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কোভিড-১৯ পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে রোগীদের লাইনগুলো দিনে দিনে ফুলে-ফেঁপে উঠছে।

নিউইয়র্ক রাজ্যে শনিবার প্রায় ২২ হাজার মানুষের করোনা ধরা পড়েছে। যা টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দৈনিক সংক্রমণের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

ব্রুকলিনের গ্রিনপয়েন্ট পাড়ায় এক ডজনেরও বেশি বার এবং রেস্তোঁরা তাদের কর্মী এবং পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

জনপ্রিয় ম্যাককারেন পার্কের কাছে প্রায় ৩০ জন লোক দ্রুত করোনা পরীক্ষা করানোর একটি মেডিকেল ভ্যানের পাশে লাইন ধরেছে।

ম্যানহাটনের ৩০ রকফেলার প্লাজায়, জনপ্রিয় স্কেচ টেলিভিশন শো ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ ঘোষণা করেছে যে, তারা সরাসরি দর্শকদের সামনে চিত্রধারন করবেনা এবং সীমিত সংখ্যক শিল্পী ও কলাকুশলী নিয়ে কাজ করবে। এর বাদ্যযন্ত্র অতিথি চার্লি এক্সসিএক্স বলেছেন, তিনি আর পারফর্ম করবেন না।

ফিনান্স বিভাগে কাজ করা ব্রুকলিনের ২৭ বছর বয়সী বাসিন্দা স্পেন্সার রেইটার বলেন, ‘এই পরিস্থিতি ২০২০ সালের মার্চ মাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে’। তিনি এবং তার বন্ধু কেটি কনলি তাদের অন্য বন্ধুদের করোনা হওয়ার পর নিজেরাও করোনা পরীক্ষা করাতে এসেছেন।

স্পেন্সার রেইটার বলেন, ‘এই লাইনগুলো দেখে মনে হচ্ছে আমরা করোনা মহামারীর শুরুর সময়ে ফিরে গেছি’। কনোলি একমত হয়ে বললেন, ‘পরিস্থিতি অবশ্যই ভয়ঙ্কর’।

 

জনমানবহীন রাস্তা

করোনা মহামারীর প্রথম তরঙ্গ ২০২০ সালের বসন্তে নিউ ইয়র্ককে হাঁটুর কাছে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল। সাড়ে ৮ কোটি মানুষের এই মহানগরী, যা ‘কখনও ঘুমায় না’, প্রায় কয়েক সপ্তাহ ধরে জনশুন্য হয়ে পড়েছিল। এর ফাঁকা রাস্তাগুলো বিজ্ঞান কল্পকাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে মহাপ্রলয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের রাস্তার মতো লাগছিল।

ম্যানহাটনের বিস্তীর্ণ রাস্তাগুলোতে শোনা একমাত্র শব্দটি ছিল অবসাদের উদ্রেককরী অ্যাম্বুলেন্স সাইরেনের হাহাকার। হাসপাতালগুলো ধারন ক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীতে উপচে পড়ছিল। মর্গগুলো কোভিড আক্রান্তদের লাশের মিছিল সামলানোর জন্য রেফ্রিজারেটেড ট্রাক আনতে বাধ্য হয়েছিল।

২০২০ সালের বসন্ত থেকে এই রোগটি নিউ ইয়র্ক সিটিতে কমপক্ষে ৩৪ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়েছে এবং শহরটি- বিশেষ করে ম্যানহাটন এলাকা- মহামারীর আগের কিংবদন্তির সেই চাকচিক্য এবং শক্তি এখনো পুরোপুরি ফিরে পায়নি।

 

‘খুব ভীতিকর’

ব্রুকলিনের ৫৪ বছর বয়সী জোলান্টা চেজারলানিস বলেছেন, ‘আমরা আসলে আবার মহামারীর শুরুর দিকে ফিরে গেছি, বা হয়তো আরও খারাপ কিছু আসছে’। সম্ভাব্য কোভিডের লক্ষণ অনুভব করার পরে তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য এসেছিলেন।

ক্যাটারিংয়ে কাজ করা চেজারলানিস বলেন, ‘এটা খুবই ভীতিকর। আমরা আশা করছিলাম যে, পরিস্থিতি ভাল হতে চলেছে’।

করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন টিকা না নেওয়াদের জন্য ‘গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর শীতকাল’ আসছে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

গত ১ ডিসেম্বর পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন করে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে তা ১ লাখ ১৭ হাজারে পৌঁছে যায়। তার মানে দুই সপ্তাহে করোনা সংক্রমণ ৩৬% শতাংশ বেড়েছে।

জন হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুসারে গত মঙ্গলবারের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ৮ লাখ মানুষ করোনায় মারা গেছে। যা এখনো বিশ্বের কোনো একটি দেশে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।

 

‘ওমিক্রনই নতুন কালপ্রিট’

করোনার এই নতুন ঢেউয়ের জন্য কে দায়ী? ‘ওমিক্রনই নতুন কালপ্রিট’, নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও সম্প্রতি সিএনএনকে বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘এবং আমাদের এই সত্য সম্পর্কেও সৎ হতে হবে যে এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং আমাদের আরও দ্রুত অগ্রসর হতে হবে’। তিনি তার নির্বাচিত উত্তরসূরি এরিক অ্যাডামসের জন্য পথ তৈরি করার কয়েক সপ্তাহ আগে একথা বলেছেন।

ডি ব্লাসিও শহরের সমস্ত কর্মচারীদের জন্য টিকাকরণ বাধ্যতামূলক করেছেন এবং ২৭ ডিসেম্বর থেকে তা শহরের বিশাল বেসরকারি খাতের ১ লাখ ৮৪ হাজার কোম্পানি এবং ব্যবসার জন্য কার্যকর হবে। তবে, অ্যাডামস ক্ষমতা নেওয়ার পরে সেই নিয়ম প্রয়োগ করবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সাধারণত এই উৎসবমূখর ছুটির মৌসুমে নিউ ইয়র্কে ঐতিহ্যগতভাবে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং অর্থনীতি চাঙ্গা থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ব্রডওয়ের আইকনিক থিয়েটার এবং মিউজিক হলগুলোকে একটি আতঙ্কের অনুভূতি গ্রাস করেছে। কারণ তাদের পারফর্মার এবং ব্যাকস্টেজ কর্মীদের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ছে। যে কারণে তারা একের পর এক শো বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।

 

ব্রডওয়েতে আতঙ্ক

শুক্রবার দিনশেষে রেডিও সিটি মিউজিক হল ঘোষণা করেছে যে, তারা ‘মহামারীর ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ’ এর কারণে তাদের বিখ্যাত ‘রকেট’ নৃত্যশিল্পী অভিনীত বাকি চারটি ক্রিসমাস শো বাতিল করছে।

বহু পুরষ্কার বিজয়ী মিউজিক্যাল ‘হ্যামিল্টন’ বৃহস্পতিবার রাতে সতর্কতা ছাড়াই বাতিল করা হয়েছিল।

মিশিগান থেকে স্ত্রীসহ আসা মাইরন অ্যাবস্টন বলেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থে শুধুমাত্র একদিন ‘হ্যামিল্টন’ দেখার জন্য উড়ে এসেছি। আজ সকালে আমরা এখানে এসেছি এবং শোটি বাতিল করা হয়েছে’।

ব্রুকলিনে এডওয়ার্ড ম্যাসিহের লেবানিজ মুদি এবং ক্যাটারিং ব্যবসা আপাতত খোলা রয়েছে।

কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, তিনি আশঙ্কা করছেন ওমিক্রনের হানায় ধনী নিউ ইয়র্কবাসীরা ম্যানহাটন ছেড়ে শহরের উত্তরাঞ্চলের অভিজাত শহরতলীতে আরও বেশি হারে চলে যাবে, ২০২০ সালে ঠিক যেমনটি ঘটেছিল। ফলে ম্যানহাটনকে আবারও ভূতের শহরের মতো হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.